অন্যান্য বিষয়, ই-লার্নিং

ফেসবুকে অনলাইন ক্লাস কতটুকু যক্তি সঙ্গত?

অনলাইন ক্লাসের নামে অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে মেয়েদর হাতে ইউটিউবফেসবুক তুলে দেয়া কতটুকু যুক্তি সঙ্গত? সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলো বিশেষ করে ফেসবুক কোনভাবেই অপ্রাপ্ত বয়স্কদের ব্যবহারযোগ্য নয়। বর্তমানে ফেসবুকে এতো বেশি বাতিল প্রোপাগান্ডা (বিভিন্ন নীতি বা মত) নির্ভর গ্রুপ ও পেজ দেখা যাচ্ছে, যেগুলোর কথা-বার্তা, ছবি, কার্যকলাপ সহজেই টিন এজারদের (বাড়ন্ত বয়সীদের) আকৃষ্ট করবে, আর শংকার বিষয় মূলত এটাই! আপনি কি ‘ব্লু হোয়েল‘ (blue whale) নামে কোন গেমে’র নাম শুনেছেন?

না শুনে থাকলে জেনে রাখুন, এটি ছিলো একটি ফোন গেম আর এটা টিন এজারদের আকৃষ্ট করেছিলো অনলাইন গ্রুপগুলো থেকে, যেখানে খেলোয়াড়’দেরকে চ্যালেন্জিং সব টাস্ক বা কাজ দেয়া হতো, যেমন মধ্যরাতে ঘুম থেকে জেগে উঠতে হবে, সকালে খালি পায়ে শিশির ভেজা ঘাসে হাটতে হবে, ছাদের রেলিং এর উপর উঠে দাঁড়াতে হবে এবং একপর্যায়ে কাজ দেয়া হতো সাহস থাকলে ছাদ থেকে লাফিয়ে দেখাও! ভাবতে পারছেন পরিনতি কি হতে পারে?

যা ভাবছেন তা’ই হয়েছিলো, যখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কিশোর-কিশোরীদের রহস্যময় আত্নহত্যা বেড়ে গেলো তখন এক পর্যায়ে জানা গেলো ব্লু হোয়েলের কথা। যাহোক, ফেসবুকের এই বাতিল পেজ ও গ্রুপগুলো কিন্তু ব্লু হোয়েলের থেকেও ভয়ংকর হতে পারে! তাই এইরকম অবস্থায় তাদেরকে ঝুঁকির মধ্যে নিয়ে যাওয়া কতটা যুক্তি সঙ্গত? যেখানে অধিকাংশ মাতা-পিতা’ই সন্তান’রা অনলাইনে আসলে কি করছে এ বিষয়ে অনভিজ্ঞ! তাহলে? কিভাবে অনলাইন ক্লাস নেয়া যেতে পারে?

যেভাবে অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে একটু ভাবলে নিশ্চয় অনেক উপায়ই পাওয়া যেতে পারে। এছাড়াও যা করা যেতে পারে:

  • প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটি নিজস্ব ওয়েবসাইট থাকতে হবে।
  • শুধুমাত্র স্কুলগুলোর জন্যে সরকারিভাবে বিনামূল্যে ভিডিও স্ট্রিমিং সার্ভার এর ব্যবস্থা করতে হবে, যেখানে স্কুলগুলো তাদের নির্ধারিত স্থানে লাইভ ও রেকর্ডেড ভিডিওগুলো সম্প্রচার ও সংরক্ষণ করবে।
  • লাইভ ও রেকর্ডেড ক্লাসের ভিডিওগুলো শুধুমাত্র স্কুলের ওয়েবসাইটের প্রতিটি ক্লাসের জন্যে নির্ধারিত স্থান থেকে সম্প্রচার ও সংরক্ষণ করতে হবে।
  • স্কুলে হাজিরা খাতার মতো অনলাইন ক্লাসেরও হাজিরা খাতা থাকতে হবে, যেন ক্লাসগুলো সকল ছাত্র-ছাত্রীদের নিকট পৌঁছেছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়।
  • ছাত্র-ছাত্রীদের অনলাইন ক্লাসে অভ্যস্ত করার জন্যে সারা বছর অন্তত একটি অনলাইন ক্লাস চালু রাখতে হবে, যেহেতু বিষয়টি এমন নয় যে সবাই হঠাৎ করে বুঝে যাবে কিভাবে অনলাইন ক্লাসে যোগ দিতে হবে।

ফেসবুকে অনলাইন ক্লাসের কয়েকটি ক্ষতিকর দিক

  • ফেসবুক একটি পাবলিক প্লেস (জনগণের মিলন স্থল), অর্থাৎ হাট-বাজারের মতো, আর হাট-বাজারে নিশ্চয় পড়ালেখা হতে পারে না।
  • ফেসবুক বাহ্যত বিনামূল্য সার্ভিসগুলো দিলেও, তারা আসলে বিজ্ঞাপন থেকে মুনাফা অর্জনের জন্যে আকর্ষণকারী সব বিজ্ঞাপন ব্যবহারকারীদের সামনে উপস্থাপন করে যা অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়েদর ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে।
  • ফেসবুক কর্তৃপক্ষ মানুষকে ‘ফেসবুক আসক্ত‘ করার জন্যে পরিচিতিজনদের মধ্যে কারা কারা ফেসবুক ব্যবহার করে এবং তারা কি কি করে এসব আকর্ষনীয়ভাবে উপস্থাপন করতে থাকে।
  • ছেলে-মেয়েরা বাতিল প্রোপাগান্ডা (নীতি, মত) নির্ভর বিভিন্ন পেজ, গ্রুপের সাথে জড়িয়ে মাদকাসক্তি ও সমাজ বিরোধীসহ বিভিন্ন ধরনের ধ্বংসাত্নক কার্য-কলাপের সাথে জড়িয়ে পড়তে পারে।
  • অত্যধিক ফেসবুক ব্যবহারে ছেলে-মেয়েরা ইর্ষাকাতর, বিষন্ন, উগ্র, অবাধ্য হয়ে উঠতে পারে যা তাদের বিনম্র, উদার ও সৎ প্রবৃত্তি গঠনে অন্তরায় হতে পারে।
  • প্রদর্শনমূলক মনোবৃত্তি গড়ে উঠতে পারে যা তাদের জীবনের সঠিক লক্ষ্য ও তা বাস্তবায়নের জন্যে প্রয়োজনীয় কর্ম-পরিকল্পনাকে ক্ষতিকরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
  • ফেসবুক আসক্তি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থের উপর বিরুপ প্রভাব ফেলতে পারে।

এছাড়াও ফেসবুকের মতো মিডিয়াগুলো এখন মিথ্যা রটনা, খবর, গুজব ছড়ানোর একটি স্থানে পরিনত হয়েছে, যেসব গুজব সম্বন্ধে প্রাপ্ত বয়স্করাও সন্দিহান ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন, সেখানে ভাল-মন্দের পার্থক্য করতে অনভিজ্ঞ ছেলে-মেয়েরা খুব সহজেই এসব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে। তাই সবার উচিৎ ছেলে-মেয়েদের ফেসবুক ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিৎ বিকল্প কোন কল্যাণকর পথে অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থা করা।

যদি সরকারিভাবে বিনামূল্যে ভিডিও স্ট্রিমিং সার্ভারের ব্যবস্থা করা না যায় তাহলে, ব্যয় সংকোচনের জন্যে পরোক্ষভাবে ইউটিউব ও ফেসবুক ব্যবহার যেতে পারে। তবে ছাত্র/ছাত্রীদেরকে সরাসরি ইউটিউব/ফেসবুকের ভিডিও লিংক না দিয়ে ভিডিওটি এমবেডেড বা ওয়েব পেজের সাথে সংযুক্ত অবস্থায় স্ব স্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে সম্প্রচার করা উচিৎ। এজন্যে সর্বাগ্রে  যা দরকার তা হলো সরকারি/বেসরকারি প্রতিটি স্কুলের জন্যে একটি ‘সচল‘ ওয়েবসাইট এবং সঠিক পদ্ধতিতে কার্যকরী একটি অনলাইন শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা।